বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন

এইচ এম হুমায়ুনকবির: কলাপাড়া উপজেলা ১২টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভায় শহর ও গ্রাম এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইজিবাইক। আর এসব চালাচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্করা। প্রশিক্ষন ছাড়াই এসব যানবাহনের স্টিয়ারিং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের হাতে থাকায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এই বয়সে কিশোরটির হাতে থাকার কথা বই-খাতা ও কলম। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্কদের হাতে এখন ইজিবাইকের স্টিয়ারিং। তবু নেয়া হচ্ছে না কোন ব্যবস্থা। গ্রাম্য সড়ক থেকে শুরু করে মহাসড়ক এখন ইজিবাইকের দখলে। চালকেরা কোন নিয়মনীতি না মেনে শহরের মধ্যে চালাচ্ছে এসব ইজিবাইক। যেখানে সেখানে তাদের বাইক থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করাচ্ছেন। চলাচররত অসংখ্য ইজিবাইকের কারনে শহরের মধ্যে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজটের। এছাড়া চালকদের মধ্যে অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও প্রশিক্ষন প্রাপ্ত না হওয়ায় হরহামেশায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
কলাপাড়া পৌরসভা সুত্রে জানা গেছে, ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে নতুন করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে আটো বড় ৪৭৭টি, মিশুক আটো ছোট ৩১০টি, আটো রিসকা ৭২ টি। এছাড়া ও দেখা গেছে, কুয়াকাটা পৌরসভার ও আমতলী শহরে থেকে কলাপাড়া শহরে অনেক চালক গাড়ী চালাতে এখানে আসে।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা শহর থেকে গ্রাম এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইজিবাইক। আর এসব চালাচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্করা। রাস্তার মাঝখানে গাড়ি ঘুরানো যত্রযত পার্কিং ও অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো কারনে ভোগান্তি শিকার হচ্ছেন হাজারো মানুষ। এছাড়া যানজটের বিশেষ কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ইজিবাইক। কোন প্রশিক্ষন ছাড়াই এবং রাস্তার নিয়মনীতি না জেনেই গাড়ি চালানোর কারনে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে জরুরি কাজে নিয়োজিত সরকারি, বেসরকারি, যাত্রীবাহী গাড়িসহ , রোগবাহী এম্বুলেন্স সঠিক সময়ে তাদের গন্তব্য পোঁছতে পারছে না। এমনকি এই ইজিবাইক কোন বৈধ কাগজপত্র নেই বললেই চলে। পৌর শহরে সদর রোডে দেখা যায় প্রতিদিনই ইজিবাইক কারনে যানজট লেগেই আছে। সরকারি ভাবে এদের নিয়ন্ত্রন না করলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে ইজিবাইক চালকেরা। ইজিবাইক সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে মিশুক।
ভুক্তভোগী অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ সকালে স্কুল কলেজে যাওয়ার সময়ে তারা প্রতিনিয়ত যানযটের শিকার হচ্ছে। তাদের অভিযোগ শহরে চলাচলরত ইজিবাইক চালকরা কোন নিয়ম শৃঙ্খলা তোয়াক্কা না করে সড়কে ইচ্ছা মত ইজিবাইক ঘুরিয়ে ফেলতে যায়। আবার রাস্তার ভাঙ্গাচোরা অংশ পরিহার করে ভাল অংশ দিয়ে যেতে চায়। ফলে তারা ঘন ঘন রাস্তায় এপাশ ওপাশ করে পথ চলে। এমন । অবস্থা মটর সাইকেলসহ দ্রæত গতির পরিবহন পেছন থেকে আগে উঠতে গেলে ইজিবাইক ধাক্কা লেগে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। ইজিবাইক চালকদের খাম খেয়ালিতে শহরের মধ্যে সৃষ্ট যানজট এখন প্রতিদিনের চিত্র। এমন অবস্থায় পড়ে সঠিক সময়ে স্কুল কলেজে পৌছতে না পেরে তাদের প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। সাধারন পথচারিদের অভিযোগ, ইজিবাইক চালকেরা শহরের মধ্যে স্থানে সেখানে তাদের বাইক পাকিং করার কারনে সৃষ্ট যানজটে ৩ মিনিটের রাস্তায় কখন ও কখন ও অনেক সময় লেগে যায়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১০ সালের দিকে প্রথমে কলাপাড়া শহরে অল্প কিছু সংখ্যক ইজিবাইক দেখা গেলেও বর্তমানে প্রায় ৮’শত অটো চলাচল করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা ইজিবাইক চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে ১২-১৩ বছরের কম বয়সের কিশোরেরাও রয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইজিবাইক সড়কে নামানো হচ্ছে। পৌর কর্তৃপক্ষ এই সব ইজিবাইক শুধু মাত্র পৌর এলাকায় চালানোর অনুমতি দিলেও তারা যাত্রী নিয়ে মহাসড়কে দ্রæতগতির যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাত্রী বহন করেছে। এই সব ইজিবাইক চালকদের মধ্যে কেউ কেউ মাঠের কৃষি শ্রমিক অথবা আগে রিকশা/ ভ্যান চালাতেন। আবার কেউ কেউ বয়সে কিশোর। এদের শত করা ৮০ জন চালকেই জানেন না কিভাবে রাস্তা ইজিবাইক চালাতে হয়। তারপরও তারা নিয়মিত মহাসড়ক ছাড়াও গ্রামা লের সড়কে ৮ জন করে যাত্রী নিয়ে দ্রæত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইজিবাইক চালক নজরুল মিয়া জানান, তিনি ৪ বছর ধরে ইজিবাইক চালিয়ে ৫ সদস্যের সংসারের জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, হারে প্রতিদিন নতুন নতুন ইজিবাইক রাস্তায় নামছে তাতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তার অভিযোগ নতুন ইজিবাইক চালকেরা আইন কানুন মানে না। কে কত টাকার ভাড়া আয় করবে তারা সেই প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। এ কারনে প্রতি নিয়ত দুর্ঘটনা বাড়ছে।
ইজিবাইক চালক নয়ন মিয়া বলেন, ৩ বছর ধরে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। আগে অনেক পয়সা রোজগার হতো কিন্তু এখন ইজিবাইক সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার রোজগার কমে যাচ্ছে। তিনি কথায় কথায় বলেন বর্তমানে শহরে এমন অবস্থা যেন মানুষের চেয়ে ইজিবাইক বেশি হয়ে গেছে।
আবু হানিফ নামে এক পথচারি বলেন, শহরের ভিতরে চলাচলরত ইজিবাইক দেখলে মনে হয় এটা যেন ইজিবাইক শহর। অনেক চালক অছেন যারা অন্য পেশার কাজ করে বিকালে শহরে এসে ইজিবাইক চালান। ফলে বিকালে শহরে অটো উপস্থিতি থাকে সারা দিনের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। তার অভিযোগ এ সমস্ত চালকদের কোন প্রশিক্ষন নেই। এর ফলে রাস্তায় দু’পাশ থেকে আসা যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্থ হয়ে যান জটের সৃষ্টি হয়। তার অভিযোগ এটা চালকদের ইচ্ছাকৃত যানজটের কারনে ভোগান্তিটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত শনিবার (২৪.০৯.২০২২) দুপুরে উপজেলার বালীয়াতলী ইউপির মুসুল্লিয়াবাদ এলাকায় সড়কে মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রলি ও ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় ছেলে জিহাদের (১০) মৃত্যুর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মা মুক্তা বেগমেরও মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাতে বরিশাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এসময় ঘটনাস্থলে নিহত হয় শিশু জিহাদ, এবং তার মায়ের দু-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এছাড়া একই অটোরিকশার যাত্রী নিহত শিশুর ১২ বছর বয়সী বড় বোন মীম আক্তার , ছোট ভাই জুনায়েদ (৬) দাদী জাহানারাসহ আরো অন্তত ৭ জন গুরুতর আহত হয়। তাদের উদ্ধার করে কলাপাড়া হাসাপাতালে নিয়ে এলে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের বরিশাল সেবাচিমে প্রেরণ করে দায়ীত্বরত চিকিৎসক। অপরদিকে মুক্তা বেগমের দুই শিশু সন্তান ও শাশুড়ি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আর নিহতের বাড়িতে চলছে এখন শোকের মাতম।
কলাপাড়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র মো.হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা একবার ইজিবাইক সমিতি সভাপতিকে নিয়ে বসছি যাতে অপ্রাপ্ত বয়স্করা ইজিবাইক চালাতে না পারে। কিন্তু এখনও হয়নি। এখন আবার আগামি মিটিং এ নিয়ে পৌরসভা মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা শংকর চন্দ্র বৈদ্য বলেন, অপ্রাপ্ত বয়স্করা যদি কেউ ইজিবাইক চালায় তাহলে এটাতো শ্রম। আমি এ ব্যাপারে মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করবো। যাহাতে অপ্রাপ্ত বয়স্করা যাতে ইজিবাইক চালাতে না পারে।
© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com
Leave a Reply